
মহেশখালী প্রতিবেদক:
মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক কালাগাজীর পাড়ার পশ্চিমে বগাচতর ঘোনার লাগুয়া নতুন ঘোনা নামে পরিচিত লবণ মাঠ ও মাছের ঘের দখলকে কেন্দ্র করে নতুন করে সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইসমাইল ও আবুলশামা বাহিনীর সশস্ত্র মহড়া এবং একদল সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী একের পর এক হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে কয়েক দফায় তারা লবণ মাঠের পলিথিন কেটে দিয়েছে, চাষাবাদে ব্যবহৃত মেশিন চুরি করেছে এবং বর্গাচাষিদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এ গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা লবণ মাঠ ও মাছ ঘেরের মূল ইজারাদার ও মালিক পক্ষকে পরিকল্পিতভাবে উৎখাতের চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা এসব বৈধ মালিকদের আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে রাজনৈতিক দোহাই দিয়ে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কুখ্যাত ডাকাত সর্দার ইসমাইল ও আবুলশামার নেতৃত্বাধীন বাহিনী গত ৩ মার্চ আমাদের থেকে ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে একের পর এক হামলা চালিয়ে চাষিদের মারধর করে, পলিথিন কেটে দেয় এবং লবণ মাঠের মেশিন রাতের আঁধারে চুরি করে নিয়ে যায়। হুমকি দিয়ে তারা বলে, “যদি সামনে থেকে এই ঘোনার মধ্যে আসো, হাত-পা কেটে ফেলব ও মেরে ফেলব। এই অপতৎপরতায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুমন ও মাহবুব আলম।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ইসমাইল বাহিনীর সদস্যরা শুধু দখলদারিত্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করতেও নানান মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য কৌশলে প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।
গত ৩০ মার্চ রাতে পরিকল্পিতভাবে লবণ ঘেরে হামলা চালিয়ে বাঁধ কেটে দিয়েছে স্থানীয় সন্ত্রাসী ঈসমাইল বাহিনী। এতে প্রায় ২ লাখ টাকার লবণ পানিতে তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঈসমাইল বাহিনী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। ক্ষতিগ্রস্ত মালিকরা এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ওরা প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করতে নানা অপকৌশল নেয়। মিথ্যা অভিযোগ তুলে প্রকৃত মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার পাঁয়তারা করে। পুলিশ ও প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে জমির বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা চালায়।
নতুন ঘোনার সাথে লাগুয়া বগাচতর ঘোনার একজন আনসার সদস্য বলেন, ‘আমরা সরকারি অনুমোদন নিয়ে বগাচতর ঘোনায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসীদের হুমকি ও হামলার শিকার হচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে অবহিত করেছি এবং আনসার ক্যাম্পের নিরাপত্তার জন্য থানায় একটি জিডিও করেছি।”
বর্গাচাষি, লবণচাষি ও সাধারণ জনগণ প্রশাসনের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ইসমাইল বাহিনীর দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না হলে এলাকার শান্তি বিনষ্ট হবে, আর সাধারণ মানুষ ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে।
একজন লবণচাষি বলেন, ‘আমরা চাষাবাদ করব, নাকি দখলদারদের সঙ্গে লড়াই করব? দিনের পর দিন আমাদের জমি কেড়ে নিতে চাচ্ছে, কিন্তু প্রশাসন এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এই ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এটি একটি সুপরিকল্পিত দখলদার চক্র। প্রশাসন যদি শুরুতেই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দখলদারিত্ব আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বলেন, ‘লবণ মাঠে নিয়ে সমস্যা হচ্ছে শুনেছি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে তা আমলে নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মহেশখালীতে জমি ও ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম নতুন নয়। তবে ২৪ জুলাইয়ের আন্দোলনের পর ইসমাইল ও আবুলশামা বাহিনীর দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপই পারে এই সমস্যা সমাধান করতে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।